ঐতিহ্যগতভাবে ভারতীয়রা হচ্ছেন ধর্মপ্রাণ মানুষ। জাতীয় সংহতির জন্য আমাদের ধর্ম এবং ভাষাকে অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন হয় না। তা কেবলমাত্র সতর্ক করে দেয় যে অন্যের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করাটা হীনম্মন্যতার পরিচায়ক। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা আমরা যখন বলি তখন তার অর্থ এই দাঁড়ায় না যে আমরা ধর্মবিরোধী। এর অর্থ হলো সকল ধর্মের প্রতি সমানভাবে সম্মান প্রদর্শন করা।
ভারতবর্ষের ধর্মীয় ঐতিহ্য :
(১) বহু বছর আগে সম্রাট অশোক অহিংসার বাণী প্রচার করেছিলেন। রক্তাক্ত কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে তিনি বলেছিলেন, “হিংসা দিয়ে রাজ্যজয় করবার পরিবর্তে মানুষের হৃদয় জয় করাটাই প্রকৃত ধর্ম”। অশোক তাঁর মহাবাণীতে বলেছিলেন, “আমরা আমাদের নিজেদের ধর্মকে ঠিকমতো শ্রদ্ধা করতে পারব না—যদি না আমরা অন্যদের ধর্মকে ঠিকমতো শ্রদ্ধার চোখে দেখতে সমর্থ হই”।
(২) জৈনধর্ম অহিংসার মূর্ত প্রতীক হিসাবে বিদ্যমান।
(৩) খ্রিস্টধর্মের মর্মবাণী হলো নিজের মতো করে তুমি তোমার প্রতিবেশীবে ভালোবাসো।
(৪) ইসলামধর্মও বলেছে, তুমি কি তোমার সৃষ্টিকর্তাকে ভালোবাসো? তাহলে ভালোবাসো মানুষকে।
(৫) শিখ ধর্মগুরু গ্রন্থসাহেবে আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছেন, প্রতিটি মানুষই হচ্ছে তাঁর সন্তান। তিনি হচ্ছেন সকলের। তিনি পৃথিবীর সর্বত্রই বিরাজমান।
(৬) আমাদের প্রজন্মের প্রবাদপুরুষ জ্ঞানতাপস বিশ্বজয়ী বীরসন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন—
‘হে ভারত, … ভুলিও না,
নীচ জাতি, মূর্খ, দরিদ্র অজ্ঞ মুচি,
মেথর, তোমার রক্ত, তোমার ভাই।’
খেলাধুলা ও শারীরশিক্ষার যেসমস্ত কার্যক্রম রয়েছে তা থেকে জাতীয় সংহতির বোধ জাগ্রত হয়। নিচে এবিষয়ে আলোচনা করা হল –
(i) দলগত খেলায় ধর্মীর সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় সংহতি বৃদ্ধি – যে কোনো দলগত খেলায় দলগঠনের সময় খেলোয়াড়দের গুণগত মান দেখে বাছাই করা হয়। তাই একটি দলের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ সমস্ত ধর্মের খেলোয়াড়ই থাকে।
খেলার মাঠের সমস্ত খেলোয়াড় তাদের ধর্মীয় বিভেদ ভুলে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটিমাত্র লক্ষ্যপূরণে ব্রতী হয়। তাই খেলাধুলোর মাঠ হল সর্বধর্মসমন্বয়ের একটি মিলন ক্ষেত্র। এই সর্বধর্মসমন্বয়ের ফলে জাতীয় সুদৃঢ় হয়।
(ii) দলগত খেলা বর্ণভেদ প্রথাকে অবলুপ্ত করে – একটি দলে বিভিন্ন জাতির খেলোয়াড় থাকে, মাঠে খেলার সময় কে উচ্চবর্ণের? কে নিম্নবর্ণের? কে ব্রাহ্মন? কে শুদ্র? তা দেখা হয় না।
সকল বর্ণের মানুষ একে অপরকে সহযোগিতা করে নির্দিষ্টলক্ষ্যে এগিয়ে যায়। এর ফলে সমাজের মধ্যে বর্ণভেদ অবলুপ্ত হয়। খেলার মাঠই আমাদের সকল বর্ণের মানুষকে, ‘মানুষ’ হিসেবে জানতে ও মানতে শেখায়, যা জাতীয় সংহতি আরও দৃড় করে।
(iii) সহযোগী, সহকর্মী মনোভাব তৈরী করে – একটি দলীয় খেলায়, দলের একজন সদস্য এককভাবে লক্ষ্যপূরণে সার্থকতা পেতে পারে না। দলের সমস্ত সদস্যদের সহযোগিতা নিয়ে যৌথভাবে মূল লক্ষ্যপূরণ করতে হয়।
এর ফলে খেলোয়াড়দের সামাজিক ক্ষেত্রেও সহযোগী মনোভাব প্রদর্শন করে, যা জাতীয় সংহতি কে আরও মজবুত করে। দলের একজন সদস্য ওপর সদস্যর অসুবিধা, দুঃখ অনুধাবন করতে পারে। দলের এক সদস্যর দুঃখকষ্টঅন্য সদস্যরা ভাগ করে নেয়, ফলে দলের মধ্যে ঐক্য তৈরী হয়। যে ঐক্য জাতীয় সংহতির মেরুদন্ড হিসেবে কাজ করে।
(iv) বিভিন শিবিরে মাধ্যমে সংহতিস্থাপন – খেলাধুলায় দক্ষতা বৃদ্দির উদ্দেশ্য বিভিন্ন আবাসিক শিবির করা হয়ে থাকে। এই শিবিরে বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন বর্ণের, বিভিন্ন জারি খেলোয়াড়দের একসঙ্গে, একই চাদের তলায়, একইরকম পরিবেশে, একই কর্জক্রমের মধ্যে থাকতে হয়।
এর ফলে একইসঙ্গে থাকা, একসঙ্গে কাজ করা, খোয়া, ঘুমানোর অভ্যস তৈরী হয় যা জাতীয় সংহতিকে আরও মজবুত করে। এই শিবিরের মহ্দ্যমে নিজেদের মধ্যে ভাবের আদানপ্রদান হয়, সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটে, এর ফলে জাতীয় সংহতি আরও মজবুত হয়।
(v) মনের দূষণ রোধ করে শারীরশিক্ষা জাতীয় সংহতি রক্ষা করে –
বিভিন্ন খেলাধুলা, ব্রতচারী ও দুঃসাহসিক অভিযানে অংশগ্রহনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ ও সৌহার্দ্যর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। খেলায় অংশগ্রহনের মাদ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের জয়কে বরণ করে নিতে পারে। তেমনি প্রতিযোগিতায় পরাজিত হয়ে হাসিমুখে সেই পরাজয় সমান গুরুত্ব অনুসরণ করে।
তাইতো খেলার শেষে জয়ী ও পরাজিত একে অপরকে আলিঙ্গন করতে এগিয়ে আসে।এই বিরল দৃষ্টান্ত অন্য কোনো ক্ষেত্রেই দেখা যায় না।খেলাধুলার মাধ্যমে আমাদের অবচেতন মনে দূষণ বিরচিত হয়ে যায়। আর এই খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতা সমাজের সর্বস্তরে সঞ্চারিত করতে পারলে জাতীয় সংহতির সুবিধা হবে।
(vi) ভাতৃত্ববোধ গড়ে তোলে : একসঙ্গে খেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে। প্রীতির বাধনে ও ভ্রাতৃত্ববোধে বাধা পরে খেলোয়াড় থেকে দর্শক সকলেই।