ক্রীড়াক্ষেত্রের অভাবনীয় উন্নতির ফলে শারীরশিক্ষার পরিধি বিস্তারলাভ ঘটেছে। তাই শরীরচর্চা, খেলা, ড্রিল, উষ্ণীকরণ, শারীরিক প্রশিক্ষণ, জিমনাস্তিকস, বিনোদন প্রভৃতি ক্ষেত্রে শারীরশিক্ষার পরিধি বিস্তৃত।
শারীরিক সংস্কৃতি : ‘শারীরিক সংস্কৃতি’ – কথাটির উত্পত্তি হয়েছে গ্রীসের বিখ্যাত ‘সৌন্দর্য্যময় শরীরের’ উপলব্ধি থেকে। এটির মূল উদ্দেশ্য হল সুষম আকার-আকৃতিসম্পন্ন দেহগঠন, যার ফলে সৌন্দর্য্য শরীরের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। শারীরিক সংস্কৃতির ধারণাটি প্রকৃতপক্ষে শরীরের বাহ্যিক সৌন্দর্য্য, যেমন – দেহের আকার; পেশীবহুলতা; গঠন; উপাদান; অনুপাত; প্রভৃতি দ্বারা প্রভাবিত দর্শনের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে।
খেলা: খেলা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি যা সৃজনশীল ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে মানুষকে আনন্দ প্রদান করে। ‘রস’-এর মতে খেলা হল “স্বতঃস্ফূর্ত, আনন্দদায়ক, সৃষ্টিশীল কার্যক্রম, যার মাধ্যমে ব্যক্তি তার সর্বোচ্চমাত্রায় আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়। খেলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল প্রকৃতিগতভাবে খেলা।
প্রতিদ্বন্দিতা বর্জিত এবং কর্জগতভাবে খেলা শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ সহায়ক, এবং শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশকালে তাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়তা করে। শিশুদের দেহ ও মনের বিকাশ ঘটাতে ‘খেলা’ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। উদাহরণ – ইকড়ি মিকড়ি, লুডো।
ড্রিল : ড্রিল হল ছন্দময়, শৃঙ্খলাবদ্ধ বিভিন্ন সৌন্দর্য্যমূলক ব্যায়ামের সমষ্টি। এর মূল লক্ষ্য হলো মৌলিক অঙ্গ-সঞ্চালনগুলির (হাঁটা, বসা, দাঁড়ানো ইত্যাদি) উতকর্জটা বৃদ্ধি করা। সামরিক বাহিনীতে এর বিশেষ প্রচলন আছে। ড্রিল শুধুমাত্র দেহভঙ্গিমা ও সুঅভ্যাস গঠনে সাহায্য করে। উদাহরণ – ডাম্বেল ড্রিল, ওয়াল্ড ড্রিল, লেজিম।
উস্নীকরণ: খেলাধুলোয় অংশগ্রহনের পূর্বে শারীরিক অঙ্গসসঞ্চালনের মাধ্যমে খেলোয়াড়ের শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি এবং শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করার প্রক্রিয়াকে উষ্ণীকরণ বলে।
এককথায় খেলাধুলোয় অংশগ্রহণের পূর্বে দক্ষতা ও কৌশলগুলিকে সঠিকভাবে প্রয়োগের জন্য যে সকল দৈহিক ক্রিয়াকলাপ ও অঙ্গসঞ্চালনের সাহায্য শরীর গরম করা হয় তাকেই উষ্ণীকরণ বলে। আবার উষ্ণীকরণকে দুভাগে ভাগ করা হয়।
১. সাধারণ উষ্ণীকরণ: সাধারনভাবে খেলাধুলোয়অংশগ্রহনের পূর্বে শরীরের প্রস্তুতির জন্য যে সকল শারীরিক ক্রিয়াকলাপ করা হয় (যেমন – জগিং, লম্বা পায়ে দৌড়, হাঁটা, ধীরগতির দৌড় ইত্যাদি) তাকে সাধারণ উষ্ণীকরণ বলে।
২. বিশেষ উষ্ণীকরণ: খেলোয়াড় যে খেলায় অংশগ্রহন করবে তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত শরীরের বিশেষ কিছু অঙ্গের যে বিশেষ শারীরিক ক্রিয়াকলাপ করা হয় তাকে বিশেষ উষ্ণীকরণ বলে।
ক্রীড়া প্রশিক্ষণ: ক্রীড়া প্রশিক্ষণ হল বিজ্ঞান নির্ভর, শিক্ষাশ্রিত, সুপর্কল্পিত ও সুগঠিত অমোন এক নির্দেশনা যা খেলোয়াড়ের শারীরিক ও ক্রীড়া কৌশলগত দিকের সঙ্গে তার মানসিক, বৌধিক ও সামাজিক দিকের প্রয়োজনীয় উন্নতি ঘটিয়ে খেলাধুলোর কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য ক্রীড়া- দক্ষতা উন্নীত করে।
শারীরিক প্রশিক্ষণের কতকগুলি উদ্দেশ্য হল:
(১) নিয়মিত ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে শরীরচর্চায় অংশগ্রহণ করা।
(২) নিয়মশৃঙ্খলা মেনে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা পরিচালিতে করা।
(৩) শরীর ও মনের কঠোরতা বৃদ্ধি করা, সমন্বিত বিকাশ ঘটানো
(৪) সুস্থ ও নিরোগ দেহ অর্জন করা,
(৫) ক্রীড়াক্ষেত্রে নিপুনতা অর্জন।
জিমন্যাস্টিক্স :
জিমন্যাস্টিক্স শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘জিমনস’ থেকে এসেছে। শুধুমাত্র গ্রিস নয়, চীনদেশেও জিমন্যাস্টিক্সের প্রচলন ছিল। সাধারণত জিমন্যাশিয়ামের মধ্যে খালি হাতে বা সরঞ্জাম নিয়ে যে সমস্ত ব্যায়াম করা হয়, তাকে জিমন্যাস্টিক্স বলে। শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জিমন্যাস্টিক্স বিশেষ ভূমিকা পালন করে এবং এটি শারীরিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অ্যাথলেটিকস:
’অ্যাথলেটিকস’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘অ্যাথলস’ থেকে উৎপন্ন হয়েছে, যার অর্থ প্রতিযোগিতা এবং এতে অংশগ্রহণকারীদের বলা হয় অ্যাথলিট।
- ব্যাপক অর্থে: সমস্ত খেলাধুলাকেই অ্যাথলেটিকস বলা হয় (যেমন: ফুটবল, কবাডি, দৌড়ানো, লাফানো ইত্যাদি)।
- সংকীর্ণ অর্থে: অ্যাথলেটিকস বলতে শুধুমাত্র ট্র্যাক এবং ফিল্ড ইভেন্টগুলিকে বোঝায়।
ইভেন্টের প্রকারভেদ:
- ট্র্যাক ইভেন্ট: রানিং ইভেন্ট (যেমন— ১০০ মিটার, ২০০ মিটার, ৪০০ মিটার ইত্যাদি)।
- ফিল্ড ইভেন্ট: লং জাম্প, হাই জাম্প, শটপাট ইত্যাদি।
- কম্বাইন্ড ইভেন্ট: ট্র্যাক এবং ফিল্ডের কিছু ইভেন্ট নিয়ে গঠিত (যেমন— ডেকাথলন, পেন্টাথলন, ট্রায়াথলন ইত্যাদি)।
বিনোদন
স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যক্তি অবসর সময়ে সমাজস্বীকৃত যে কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ও সহজাত তৃপ্তিলাভ করে তাকে বিনোদন বলে। বিনোদনের প্রধান চারটি শর্ত:
১) অবসর সময়
২) স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ।
৩) সমাজস্বীকৃত কাজ।
৪) সহজাত তৃপ্তিলাভ।
বিনোদনের প্রকারভেদ:
দৈনন্দিন জীবনের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিনোদনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বিনোদনকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
- প্রত্যক্ষ বিনোদন: সরাসরি খেলায় অংশ নেওয়া (যেমন— ফুটবল খেলা)।
- পরোক্ষ বিনোদন: খেলা দেখা (যেমন— মাঠে ফুটবল খেলা দেখা)।
- সৃজনশীল বিনোদন: সৃষ্টিশীল কাজে লিপ্ত হওয়া (যেমন— ফুটবল খেলা বিষয়ক সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লেখা)।