মেদাধিক্য সম্পর্কে কিছু বিবরণ

শরীরে মেদের পরিমাণ অত্যধিক হলে এবং মেদকলা বৃদ্ধি অস্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার অবস্থাকে স্থূলত্ব বলে। সাধারণত পূর্ণবয়স্ক পুরুষের ওজনের ১৫% এবং মহিলার ২৫% মেদ থাকে। এই মেদের পরিমাণ ৫% বেশি হলে স্থুলত্বের সৃষ্টি হয়। 

মেদাধিক্য : দেহের ফ্যাটের পরিমাণ বেশি হলে বা দেহে অতিরিক্ত চর্বি সঞ্চিত হলে যে অবস্থা সৃশিত হয় তাকে মেদাধিক্য বলে। 

অতিরিক্ত মোটা বা ওজন বৃদ্ধির কারণ: অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাওয়ার অনেকগুলি কারণ রয়েছে। যেমন –

অধিক তাপমুল্যর খাদ্য গ্রহণ – কোনো কোনো পরিবারে আবহমানকালে থেকেই মাখন, ঘি, চিনি, ঠান্ডা পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার ইত্যাদি অত্যাধিক তপনমূল্যর খাদ্য বেশি পরিমাণে খাওয়ার প্রথা প্রচলিত। এক্ষেত্রে মত হওয়া প্রায় বংশগত পর্যায়ে দাঁড়াতে পারে।  কিন্তু আসল কারণ হল প্রয়োজনের অধিক তপনমূল্য খাদ্যগ্রহণ। 

শরীরচর্চার অনভ্যাস – শরীরচর্চা বা নিয়মিত ব্যায়াম না করা মত হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। গৃহীত খাদ্যশক্তির যদি সঠিক ব্যয় না করা যায় তাহলে স্থূলত্ব আসতে পারে। 

আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তি – অর্থ্যনৈতিকভাবে স্বচছল ব্যক্তি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি খাদ্য গ্রহণ থাকেন, যা তাকে স্থুলকায় ব্যক্তিতে পরিণত করে।

হরমোনের ভারসাম্য অভাব – অনেক সময় থাইরয়েড ও পিটুইটারি গ্রন্থী থেকে উপযুক্ত হরমন নিঃসৃত না হলে বিপকক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটে।  ফলে দেহ স্থুলকায় হয় এবং ওজন বৃদ্ধি পায়। 

খাদ্যভ্যাস – প্রয়োজনের তুলনায় অধিক খাদ্যগ্রহণ মত হওয়ার প্রধান কারণ। 

বয়সের কারণ – ২৫ বছর বয়সের পর থেকে প্রতি বছর ১ কিলোগ্রাম শরীরের ওজন বির্দ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।  অল্পবয়সে দেহের চাহিদা অনুসারে যে ধরনের খাদ্য খাওয়া হয় তা অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সে ত্যাগ করতে না পারলে অতিরিক্ত খাদ্যর জন্য দেহ স্থুলকায় হয়ে পড়তে পারে। 

মেদ কমাতে কী কী করতে হবে:

(১) শাক সবজি বেশি এবং স্নেহজাতীয় খাবার কম খেতে হবে : সকালে পেট ভরে খাদ্য গ্রহণ করা উচিত তাহলে সেই ক্যালোরি সারাদিনে কাজ করবার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় হবে ফলে অতিরিক্ত মেদ শরীরে জমা হবে না। দুপুর, সন্ধে ও রাতে হালকা ও পুষ্টিকর খাদ্য গরহন করতে হবে।  রাত্রে খাদ্য গ্রহনের পর অন্তত ১৫ মিনিট হাঁটা উচিত। অধিক পরিমান শাকসবজি খেতে হবে এবং স্নেহজাতীয় খাদ্য, মাছমাংস যথাসম্ভব কম বা প্রয়োজনমত খেতে হবে। 

(২) বেশি খাওয়া উচিত নয়: শিশুদের খিদে পেলে তবেই খেতে হবে।  তবে এককালীন বেশি করে না খাওয়া উচিত। প্রতিদিন চারবেলা খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। 

(৩) পরিমিত ঘুম: যখন তখন ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। 

(৪) ঘাম-ঝরানো ব্যায়াম: প্রতিদিন ৩০-৬০ মিনিট ধরে ঘাম-ঝরানো ব্যায়াম করতে হবে। 

(৫) ফাস্টফুড বর্জন: মিষ্টি জাতীয় খাবার, ফাস্টফুড, রাস্তায় তৈরী খাবার ও অতিরিক্ত তেল-ঝাল মশলাযুক্ত খাবার বর্জন করতে হবে। 

(৬) খেলাধুলো – ব্যায়াম অংশগ্রহণ: খেলাধুলা ব্যায়াম শরীরচর্চা নিয়মিত অংশগ্রহণ করতে হবে। 

(৭) সক্রিয় থাকতে হবে: কম্পিউটারে বেশি সময় কাটানো, টিভি দেখা ও ভিডিও গেমস খেলা কমাতে হবে।  হাঁটা, দৌড়ানো, বাড়ির বাইরে খেলাধুলা করা ইত্যাদির মত বাড়ির বাইরের ক্রিয়াকলাপগুলি বৃদ্ধি করতে হবে। 

(৮) চাপ নিয়ন্ত্রণ: চাপ নিয়ন্ত্রণের অর্থ যোগব্যায়াম, ইতিবাচক মনোভাব, সমস্যা ভাগ করে নেওয়া, সামাজিকতা, নিখুত ঘুম হওয়া। 

মধ্যমমাত্রায় শারীরিক ক্রিয়াকলাপ অংশ গ্রহণের সুফল – যা বৃদ্ধি করে:

  • ​মনোযোগ
  • ​নমনীয়তা ও ভারসাম্য
  • ​স্বাস্থ্যকর শারীরিক ওজন
  • ​আত্মবিশ্বাস
  • ​পেশি ও হাড়ের শক্তি
  • ​খেলাধুলায় অবদান
  • ​রোগ প্রতিরোধ
  • ​সুস্থতা
  • ​সুখকর অনুভূতি
  • ​সমস্যার সমাধান, কোনও বিষয় নির্ধারণ করে নেওয়া ও পর্যবেক্ষণের দক্ষতা

যা হ্রাস করে:

  • ​অতিরিক্ত ওজন
  • ​স্থূলতার ঝুঁকি
  • ​রক্তে কোলেস্টেরল
  • ​উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি
  • ​চাপ, উদ্বেগ ও হতাশা
  • ​হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ও কর্কট রোগের বৃদ্ধির ঝুঁকি
  • ​শারীরিক বিকলঙ্গতা বৃদ্ধির ঝুঁকি

মধ্যমমাত্রায় শারীরিক ক্রিয়াকলাপ যা সহায়তা করে:

  • ​ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে।
  • ​হাড়, পেশি ও সন্ধিগুলিকে সুস্থ রাখতে ও সুস্থতা বজায় রাখতে।
  • ​শরীরের অনাক্রম্যতার কার্যকারিতা উন্নত করে রোগ প্রতিরোধ করতে।
  • ​শরীরকে সুরক্ষিত করা ও সুস্থতা বর্ধিত করার মাধ্যমে কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করতে।

আপনার প্রাত্যহিক শারীরিক ক্রিয়াকলাপ যুক্ত করার কিছু সহজ উপায়:

  • ​রিমোট কন্ট্রোলের পরিবর্তে উঠে গিয়ে টিভি চ্যানেলটি পরিবর্তন করতে হবে।
  • ​না থেমে কমপক্ষে ১০ মিনিট আপনার পছন্দের যেকোনো খেলা খেলতে হবে।
  • ​বাড়ির কাজকর্মে যেমন বাড়ি পরিষ্কার করা, বাগান করা ইত্যাদিতে সহায়তা করতে হবে।
  • ​ধীরে ধীরে শুরু করতে হবে ও অল্প অল্প করে বাড়াতে থাকতে হবে। এটিকে আপনার দৈনিক নিত্যকর্মের একটি অংশ হিসাবে রাখতে হবে।
  • ​যখন কোথাও ভ্রমণ করতে হবে, তখন ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে, বাসস্টপে বসে বা অপেক্ষা করার থেকে হেঁটে বেড়াতে হবে।
  • ​ফোনে কথা বলার সময় হাঁটতে হবে।
  • ​দিনে শরীরচর্চা-পরিকল্পনার জন্য সময় বের করতে হবে।

স্বাস্থ্যরক্ষায় খাদ্যর ভূমিকা

Leave a Comment