ভূমিকম্প কী, তাঁর আগাম সতর্কতা এবং মোকাবিলা

​ভূ-অভ্যন্তরে সৃষ্টি হওয়া কোনো কম্পনের ফলে ভূত্বক (পৃথিবীর উপরিভাগ) যখন হঠাৎ কেঁপে ওঠে তখন তাকে ভূমিকম্প বলে। ভূগর্ভের মধ্যে যে নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয় তাকে বলে ভূমিকম্পের কেন্দ্র। আর কেন্দ্রের ঠিক উপরে অবস্থিত ভূত্বকের স্থানকে বলে উপকেন্দ্র।

​ভূমিকম্পের শক্তি মাপা হয় রিখটার স্কেল দিয়ে, ১ থেকে সর্বাধিক প্রায় ৯ মাত্রা পর্যন্ত এর মান হয়ে থাকে। আর ভূমিকম্পের তীব্রতার মাত্রা সিসমোগ্রাফ যন্ত্রের সাহায্যে পরিমাপ করা যায়। এছাড়া ভূমিকম্পের ব্যাপকতা মাপার জন্য এম এম এস মাপক ব্যবহার করা হয়।

​(ক) ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি আটকাতে ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুতি

​ভূমিকম্পের ফলে ঘরবাড়ি পড়ে যেতে পারে, যার মধ্যে অনেক মানুষজন আটকে পড়তে পারেন। রেল ও সড়কপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে, ফলে ত্রাণ পৌঁছোতে দেরি হতে পারে। এরকম অবস্থায় আটকে পড়া মানুষদের দ্রুত সাহায্য করাটা সবথেকে জরুরি। ছাত্রছাত্রীরা খুব ভালোভাবে প্রাথমিক সাহায্যকারীর এবং প্রাথমিক শুশ্রূষাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে। আর তার জন্য তাদের থাকা চাই প্রাথমিক শুশ্রূষা করার ন্যূনতম জ্ঞান। ভূমিকম্প যেসব অঞ্চলে খুব ভয়ংকর প্রভাব ফেলে সেইসব অঞ্চলে ছাত্রছাত্রীদের যে কাজটা সবথেকে বেশি করে করার দরকার তা হলো ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি।

(খ) ভূমিকম্পের পূর্বের আগাম সতর্কতা কী গ্রহণ করতে হবে

  • সেতু, স্কুল, অফিস, বাড়ির দেয়ালে বা ছাদের প্লাস্টারে ফাটল ধরলে তা সারিয়ে ফেলতে হবে।
  • ​শেলফ বা তাকগুলি শক্তপোক্তভাবে দেয়ালে আটকাতে হবে।
  • ​ভারী জিনিসপত্র তাকের নীচের দিকে রাখতে হবে।
  • ​সহজে পড়ে ভেঙে যেতে পারে এমন জিনিসপত্র তালাচাবি দেওয়া আলমারিতে রাখতে হবে।
  • ​বিদ্যুৎ সংযোগ লাইনে বা গ্যাসের পাইপে কোনো সমস্যা থাকলে তা ওই দিনই সারিয়ে ফেলতে হবে।
  • ​এলপিজি সিলিন্ডার, রেফ্রিজারেটর ইত্যাদি দেয়ালে বা মেঝের সঙ্গে আটকে রাখতে হবে।
  • ​আপৎকালীন ফোন নম্বরগুলি মোবাইলে সেভ করে রাখতে হবে।
  • ​বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য ‘মক ড্রিল’ বা আপৎকালীন পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি নেওয়া ‘মক শো’ মাঝেমধ্যেই অনুশীলন করানো উচিত।

(গ) বিপর্যয় মোকাবিলার কিট-এ কী রাখতে হবে

  • ​ব্যাটারিচালিত টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি;
  • ​ব্যাটারিচালিত রেডিও বা ট্রানজিস্টর;
  • ​ফার্স্ট এইড বক্স;
  • ​জল পরিশোধক বড়ি একটি মোড়কে ভরে রাখতে হবে;
  • ​মোমবাতি ও দেশলাই বা লাইটার পলিথিনে মুড়ে রাখতে হবে;
  • ​ছুরি, মোটা দড়ি ও শক্তপোক্ত জুতো;
  • ​শুকনো খাবার এবং পানীয় জলের সিলড বোতল বা পাউচ;
  • ​ক্লোরিন ট্যাবলেট

ভূমিকম্পের সময় ঘরের ভিতরে থাকলে কী করতে হবে

  • ভূমিকম্পের আভাস পাওয়ামাত্রই ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
  • ​চারপাশে বাড়িঘর নেই এমন কোনো ফাঁকা জায়গায় গিয়ে হাঁটু গেড়ে মাথা ঢেকে বসতে হবে।
  • ​একবার খোলা বা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছানোর পর কম্পন বন্ধ হওয়া পর্যন্ত সেখানেই অপেক্ষা করতে হবে।
  • ​ঘরের বাইরে বেরোতে না পারলে তৎক্ষণাৎ হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটু ও কনুই-এর উপর ভর করে কাছের কোনো শক্তপোক্ত কোনও টেবিল বা খাটের তলায় আশ্রয় নিতে হবে। না থাকলে ঘরের কোনায় দুই হাত দিয়ে মাথা ও মুখ ঢেকে বসে থাকতে হবে। ভিতরের ঘরের দরজার লিন্টনের নিচেও বসা যেতে পারে।
  • ​কাচের আসবাবপত্র থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
  • ​ভূমিকম্পের সময় অসুস্থ হয়ে বিছানায় থাকলে বালিশ দিয়ে মাথা ও মুখ আড়াল করতে হবে।
  • ​ভূমিকম্পের সময় বাইরে বেরোতে পারলে ভালো। কিন্তু বাস্তব বলছে, কম্পন চলাকালীন ভিতর থেকে বাইরে বেরোনোর সময়ই দুর্ঘটনাগ্রস্ত হচ্ছে বেশি মানুষ।
  • ​বাইরে বেরোতে যাদের অনেক সময় লাগবে তাদের ভিতরেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
  • ​টিভি, ফ্রিজ, গ্যাস, বন্ধ করে রাখা উচিত। কেবলমাত্র ব্যাটারিচালিত রেডিও ব্যবহার করতে হবে।
  • ​বাড়ি করার সময় ভূকম্পরোধক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। ভূমিকম্পরোধী বাড়িতে বসবাস করতে হবে।

(ঘ) ভূমিকম্পের সময় ঘরের বাইরে থাকলে কী করতে হবে

  • ভূমিকম্পের আভাস পাওয়া মাত্রই আশেপাশে বড়ো বাড়ি, লাইট পোস্ট বা গাছ থাকলে তার থেকে দূরে সরে দাঁড়াতে হবে।
  • ​বেশি ছোটাছুটি না করাই ভালো।
  • ​কোনো খোলা জায়গায় থাকলে কম্পন না থামা পর্যন্ত সেখানেই থাকতে হবে। কোনো বাড়ির দেয়াল বা গেট থেকে সরে থাকাই ভালো।

​(ঙ) ভূমিকম্পের সময় গাড়িতে থাকলে কী করতে হবে :

  • ​ভূমিকম্পের আভাস পাওয়া মাত্রই নিয়ম মেনে যত দ্রুত সম্ভব গাড়ি থামাতে হবে।
  • ​বড়ো বিল্ডিং বা ফ্লাইওভারের কাছাকাছি না থাকাই ভালো।
  • ​বিদ্যুতের তারের দিকে নজর রাখতে হবে।
  • ​কম্পন থেমে গেলে এমন রাস্তা বা ব্রিজ ব্যবহার করবে না যা ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

​(চ) ভূমিকম্পের সময় কী করা যাবে না :

  • ​হুড়োহুড়ি না করে সিঁড়ি দিয়ে এক-এক করে লাইন দিয়ে নিচে নামতে হবে। হুড়োহুড়ি করে বাড়ি থেকে বেরোতে গেলে আঘাত লাগার এবং পদপিষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • ​লিফট ব্যবহার করা উচিত নয়।
  • ​কাচের দরজা, জানালা, আলমারির কাছে থাকা উচিত নয়।
  • ​বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে কোনো উঁচু ভাঙা বাড়ি বা ইলেকট্রিক পোল-এর সামনে দাঁড়ানো উচিত নয়।
  • ​ভূমিকম্প চলাকালীন চলন্ত গাড়িতে থাকা উচিত নয়।
  • ​ভূমিকম্পের সময় সিঁড়িতে বা ঝুলবারান্দায় থাকা উচিত নয়।

(ছ) ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে গেলে কী করতে হবে :

  • ​ভূমিকম্পের আভাস পাওয়ামাত্রই দেশলাই জ্বালাবে না।
  • ​লাথি মেরে চাঙড় বা ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করবে না।
  • ​মুখ আর মাথা বাঁচিয়ে উদ্ধারকারী দলের অপেক্ষা করতে হবে।
  • ​চিৎকার না করাই ভালো। মুখে ধুলো ঢুকে গেলে শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে।
  • ​সঙ্গে বাঁশি জাতীয় কিছু থাকলে বাজাতে হবে অথবা শব্দ করে উদ্ধারকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করতে হবে।

​(জ) ভূমিকম্পের পরে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে

  • ​গুজবে বিশ্বাস করবে না, গুজব ছড়াবে না।
  • ​আফটার শক আসতে পারে, তাই প্রস্তুত থাকতে হবে।
  • ​জল, শুকনো খাবার, টর্চ লাইট, রেডিও ও ফার্স্ট এইডের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের কাছে রাখতে হবে।
  • ​ভূমিকম্প বা আফটার শকের সর্বশেষ তথ্য পেতে বা সতর্কবাণী সম্পর্কে জানতে টিভি বা রেডিওতে খবর শুনতে হবে।
  • ​রান্নাঘরে গ্যাস বা স্টোভ চালু থাকলে বন্ধ করে দিতে হবে।
  • ​খোলা জায়গায় আগুন জ্বালাবে না।
  • ​গ্যাস লিক হয়েছে সন্দেহ হলে কোনো বৈদ্যুতিক সুইচে হাত দেবে না।
  • ​বিদ্যুৎ সংযোগে কোনো ত্রুটি নজরে এলেই মেইন সুইচ বন্ধ করে দিতে হবে।

প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ ব্যবহার বিষয়ক সচেতনতা অভিযান

Leave a Comment